সর্বনাশা অনলাইন জুয়া: রৌমারীর ঘরে ঘরে হাহাকার
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
সীমান্তঘেঁষা শান্ত জনপদ কুড়িগ্রামের রৌমারী। একসময় এই অঞ্চলের মানুষের আলোচনায় থাকত কৃষি কিংবা যমুনার ভাঙন। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই দৃশ্যপট বদলে গেছে এক অদৃশ্য নেশার ছোবলে। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে রৌমারীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে অনলাইন জুয়া। শহর থেকে শুরু করে দুর্গম চরাঞ্চল—কোথাও বাদ নেই এই মরণনেশার বিস্তার। ১. যুবসমাজের অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা রৌমারীর চা-দোকান থেকে শুরু করে আনাচে-কানাচে এখন কিশোর-তরুণদের জটলা দেখলেই বোঝা যায় তারা কোনো সাধারণ আড্ডায় নেই। অধিকাংশেরই চোখ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, যেখানে চলে বিদেশি বিভিন্ন অ্যাপ ও সাইটের মাধ্যমে বাজি ধরা। সমাজকর্মীদের মতে, এই জুয়া কেবল আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং একটি প্রজন্মকে শ্রমবিমুখ করে তুলছে। স্থানীয় এক সমাজকর্মী মোঃ নাজমুল চৌধুরী (নয়া) আক্ষেপ করে বলেন, “ছেলেরা এখন পড়াশোনা বাদ দিয়ে দ্রুত বড়লোক হওয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। পকেটে টাকা না থাকলে তারা চুরি, ছিনতাই এমনকি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। পরিবারে বাড়ছে অশান্তি, বিচ্ছেদ এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনা।” ২. পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষ জুয়াড়িরা শুধু তরুণ সমাজই নয়, এর শিকার হচ্ছেন নিম্নআয়ের দিনমজুর ও কৃষকরাও। হাড়ভাঙা খাটুনির পর আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বিদেশে পাচার হওয়া এসব জুয়ার সাইটে। আর্থিক ক্ষতি: রৌমারীর বাজারগুলোতে টাকার তারল্য কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকে এই জুয়াকে দায়ী করছেন।
সংসার ভাঙন: জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে শেষ সম্বল জমি কিংবা হালের গরু বিক্রি করে অনেক পরিবার এখন রাস্তায় বসেছে। ৩. আইনি জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশে প্রচলিত ১৮৬৭ সালের প্রকাশ্য জুয়া আইন (Public Gambling Act) অত্যন্ত সেকেলে। যেখানে কেবল সশরীরে জুয়া খেলার শাস্তির বিধান আছে। যদিও বর্তমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও টেলিকমিউনিকেশন আইনে অনলাইন জুয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তবুও এর প্রয়োগ রৌমারীর মতো প্রান্তিক এলাকায় বেশ চ্যালেঞ্জিং।
আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, এই অপরাধ দমন করা শুধু পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ জুয়ার অ্যাপগুলো নিয়মিত ডোমেইন পরিবর্তন করে এবং আর্থিক লেনদেন হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (বিকাশ, নগদ) মাধ্যমে। ফলে অপরাধীদের ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে। ৪. উত্তরণের পথ কী? রৌমারীকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপের বিকল্প নেই: সামাজিক প্রতিরোধ: মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রচারণা চালাতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে যে তাদের সন্তান মোবাইলে দীর্ঘ সময় কী করছে। কঠোর নজরদারি: স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের অস্বাভাবিক লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।
বিকল্প কর্মসংস্থান: তরুণদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে আইটি খাতের সঠিক ফ্রিল্যান্সিং কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, যেন তারা ‘শর্টকাট’ পথে টাকা আয়ের মোহ ত্যাগ করে। রৌমারীর আকাশ এখন অনলাইন জুয়ার কালো মেঘে ঢাকা। সময় থাকতে যদি এই অদৃশ্য ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে এই জনপদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে একজোট হয়ে এই নেশার বিরুদ্ধে সামাজিক যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। “জুয়া কোনো ভাগ্য পরিবর্তনের পথ নয়, বরং এটি ধ্বংসের সুনিশ্চিত মহাসড়ক।”