“স্মরণ: বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ইমান আলীর জন্মশতবর্ষ”
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
ব্রিটিশ শাসনামলে রংপুরের রৌমারী অঞ্চলে শিক্ষার হার অত্যন্ত কম এবং অনুন্নত ছিলো, যা তৎকালীন গ্রামীণ প্রত্যন্ত ও সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ চিত্র ছিলো, যেখানে বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র্য ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলো এবং আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্হা মূলত শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিলো।
শিক্ষার হার না থাকা ও পশ্চাৎপদ চিন্তায় পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ ছিলো মূল জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো রৌমারী, যোগাযোগ ব্যবস্হা অনুন্নত থাকার ফলে এ অঞ্চলে সরকারি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে নি। তাছাড়া এ অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এতো খারাপ ছিলো যে তাদের পক্ষে শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব না অন্য দিকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় স্কুল,কলেজ ও শিক্ষক ছিলো না। তখনকার সময়ে রৌমারীতে শিক্ষার হার ছিলো খুবই নগন্য যা মূলত জমিদার সম্পন্ন পরিবারের কিছু সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো।
এরকম অবস্থায়ও তৎকালীন সময়ে অবিভক্ত রংপুর জেলার রৌমারী উপজেলা যা আজ কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলা নামে পরিচিত।এই রৌমারী উপজেলার পূর্ব পাখীউড়া গ্রামের একজন কৃষক ছিলেন মহর উদ্দিন মুন্সী। তিনি পেশায় কৃষক হলেও সে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন ও সমাজ সচেতন মানুষ ছিলেন। তাইতো তিনি তার সমস্ত ছেলে মেয়েদের তৎকালীন সময়ে পড়াশোনা শিখানোর চেষ্টা করে ছিলেন পুরোপুরি সফল না হলেও সে সময় তার মেয়েদেরও পর্যন্ত স্কুলের দৌড় গোড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়ে ছিলেন।
মহর উদ্দিন মুন্সীর ৬ সন্তানাদির মধ্যে বড় ছেলের নাম ছিলেন ইমান আলী, যিনি বুয়েটের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
ইমান আলী ১৯২৬ সালের ১ লা ফেব্রুয়ারী তার নিজ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার প্রথম শিক্ষা শুরু করেন তার নিজ গ্রামের একটি পাঠশালায়, পরে পাশের গ্রামের একটি মক্তবে ( পরে এটি টাপুর চর মক্তব মাদ্রাসা)। এ অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় তিনি মাত্র ১০ বছর বয়সে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে আসামের ধুবড়ী চলে যান, ধুবড়ী ছিলো তার নানার বাড়ি। ইমান আলী মামার বাড়ি থেকে আসাম প্রদেশের ধুবড়ীর সুখচর মধ্য ইংরেজি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে আসাম মাধ্যমিক ইংরেজি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ১৯৩৯ সালে প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের পদে উত্তীর্ণ হয়ে অসাধারণ মেধা শক্তির পরিচয় দেন। এ পরীক্ষায় আসাম প্রদেশে প্রথম স্হান অধিকার করেন। পরে তিনি ১৯৪০ সালে ধুবড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৪৪ সালে ধুবড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে দুই বিষয়ে লেটার নম্বর সহ প্রথম বিভাগে পাশ করেন। এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে ছিলো কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীনে। পূর্ব বাংলার ছাত্রদের মধ্যে ইমান আলী ছিলেন প্রথম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী ছাত্র। আইএসসি পড়ার জন্য ইমান আলী গৌহাটি কলেজে ভর্তি হন। ঐ কলেজে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত ছাত্র কিন্তু তার বাড়ি বঙ্গ প্রদেশে হওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাকে বৃত্তি প্রদান না করে ২য় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত ছাত্রকে বৃত্তি প্রদান করেন। আর্থিক অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তান ইমান আলী সেখান থেকে চলে এসে ১৯৪৫ সালে করোটিয়া সাদত কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ চালু না থাকায় তিনি গণিত বিষয় নিয়ে আই এ ক্লাসে ভর্তি হন।
১৯৪৭ সালে এ কলেজ থেকে ঢাকা বিভাগে প্রথম স্হান দখল করে ইমান আলী আই এ পাশ করেন ( তৎকালীন সময়ে এ কলেজ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীনে ছিলো)। পরে ইমান আলী ১৯৪৭ সালে ঢাকার অধিবাসী ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংক শাস্ত্রে অনার্স ক্লাশে ভর্তি হন এবং ইমান আলীর প্রতিভার জ্বলন্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে এখানেও ১৯৫০ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হইয়া গণিতে বিএ( সম্মান)পাশ করেন।
ঢাকা এর অধিবাসী ছাত্র হিসেবে ( সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) এম এ ক্লাশে অধ্যয়ন কালে আর্থিক ও মানসিক কষ্টে ভোগেন ইমান আলী যে কারণে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণি লাভ করেন কিন্তু প্রথম স্হানটি তার মুষ্ঠিতে আবদ্ধ থাকে। ১৯৫২ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হইয়া ফলিত গণিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাশ করেন।
শিক্ষা জীবনে ম্যাট্রিক পাশের পর আই এ পরীক্ষার পর ১ বছর উচ্চ বিদ্যালয়ে বিশেষ ভাবে গণিতে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৩ সালের ১ লা ফেব্রুয়ারী ঢাকার অধিবাসী হিসেবে জগন্নাথ কলেজে লেকচারার পদে নিয়োগ পরে ১৯৫৪ সাল হইতে ১৯৬২ সালের ২০ শে নভেম্বর পর্যন্ত এই জগন্নাথ কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান হিসেবে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬২ সালের ২১ শে নভেম্বর ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে গণিত বিভাগের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তৎকালে এই বিভাগের অন্য শিক্ষকগণ ছিলেন সরকারি কলেজ হইতে ধারকৃত তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত, পরে তা বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমান আলী গণিতের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৬৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে বোলডার এ ডক্টরেট ডিগ্রি করার জন্য বৃত্তি লাভ করেন। কিন্তু অসুস্থ ইমান আলীর দেহ এমন ভাবে ভেঙে পড়েন যে তিনি গবেষণা সমাপ্তি না করেই দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮৬ সালে ইমান আলী সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে বুয়েট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পর্বতসম প্রতিভা নিয়ে অধ্যাপক ইমান আলী জন্মগ্রহণ করে ছিলেন ঠিকই কিন্তু সে প্রতিভার বিকাশ ঘটেনি নিঃসন্তান ইমান আলী ছিলেন মানসিক ভাবে দুঃখী প্রতিভা বিকাশে দেহ তাকে বারবার বিরুপ প্রতিক্রিয়া করেছে। শ্বেতী ও ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগের সাথে পাল্লা দিয়ে জীবনের অধিকাংশ সময় তাকে কাজ করতে হয়েছে। এ অশান্তিকে সাথী করেও তিনি রচনা করেছেন তার ছাত্র ছাত্রীদের জন্য কয়েক খানা মূল্যবান গ্রন্থ। গ্রন্থগুলোর নামঃ Plane Trigonometry, Intermediate Geometry, Commercial Mathmetics, Matrics and Liner Transformation, Tensor Analysis.
পুরস্কারসমূহঃ ১৯৫০ সালের অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স পরীক্ষায় সর্বোচ্চ মেধা ও নম্বর বেশি পাওয়ার জন্য ইমান আলী নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক পুরস্কার পান , সর্বোচ্চ মেধা ও গণিতের উপর বেশি বই লেখার জন্য পুরস্কার পান। জগন্নাথ কলেজ তাকে অসাধারণ মেধা শক্তির জন্য ও বেশি টাকা বেতন পাওয়ার জন্য পুরস্কৃত করে ছিলেন।
ইমান আলী বগুড়ার সারিয়াকান্দির এক নবাব পরিবারের কন্যা রহিমা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, পরবর্তীতে রহিমা ইমান নামে তাহার পরিচিতি লাভ করে। ইমান আলী রাজশাহীতে গিয়ে ছিলেন একটি শুট্যার টুর্নামেন্ট প্রতিযোগিতায় অতিথি হয়ে, সে সময়কার মেয়েরা এ খেলা খেলতো আর সে খেলায় অংশগ্রহণ করে ছিলেন নবাব পরিবারের কন্যা রহিমা খাতুন, আর সে শুট্যার প্রতিযোগিতায় ইমান আলীর পছন্দ হয় রহিমা খাতুনকে এবং প্রস্তাবের ভিত্তিতে পারিবারিক সম্মতিতে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ( উল্লেখ্য এই যে, মেজর জিয়া মিসেস ইমানের আত্বীয়া ছিলেন তৎকালীন সময় থেকে মিসেস ইমানের পরিবারের সদস্যরা লন্ডনে বসবাসরত)।
ইমান আলী যতগুলো গণিত বিষয়ের উপর বই লিখেছেন সমস্ত বইয়ের জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি,পরিমিতি চিত্র ও অঙ্কন নিজ হাতে করেছেন রহিমা ইমান। ইমান আলী তাহার সমস্ত বই উৎসর্গ করেছেন তার স্ত্রী রহিমা ইমানের নামে। ১৯৮৬ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় রহিমা ইমান মৃত্যুবরণ করেন। ইমান আলী তার স্ত্রীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন এবং একাকীত্ব অনুভব করেন যার ফলশ্রুতিতে তার পক্ষে আর নতুন করে গণিত বই বা গণিতের নিয়ম – সূত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে উঠে নি। বিপত্নীক ইমান আলী তার ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে পুরাতন ঢাকার প্যারীদাস রোডে তার নিজ বাসগৃহ সাইন্স কর্ণার বাড়িতে গণিতের জটিল সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় ছিলেন কিন্তু অসুখী ইমান আলী ব্যক্তি জীবনে নিঃসন্তান ও একাকীত্ব হওয়ায় সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারেনি।
ইমান আলীর কিছু উক্তি যা আজও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা যুগাবে —-
প্রশ্নঃ সুন্দর জীবন বলতে কি বুঝেন?
উত্তরঃ একটা সুন্দর জীবন বলতে জ্ঞান অর্জন সৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন এবং মহৎ কিছু করার অদম্য ইচ্ছা এবং এতদাসম্পৃক্তি কাজের সাথে ব্যাপৃত থাকে।
# সমালোচকের উপর অসন্তুষ্টি না হইয়া নিজের দোষ ত্রুটিগুলো ধরার চেষ্টা এবং নিজেকে শোধরাইয়া ফেলার চেষ্টা করা।
#আলস্য ত্যাগ করা এবল কাজ ফেলিয়া না রাখিয়া প্রত্যেকটি দেয় কাজ সময় মতো বিশ্বস্ততার সাথে সম্পাদন করা।
# জ্ঞানী ও ভালো লোকই বন্ধু হিসেবে গ্রহনযোগ্য অন্যেরা সহচর মাত্র।
#আপোষের মনোভাব পোষণ না করা
# চাটুকারিতা বর্জন
# বিশ্রাম বলতে কর্মবিমুখতা বুঝায় না, একটি কাজ সুন্দর ভাবে সম্পাদন করার পর যে আনন্দ ও তৃপ্তি পাওয়া যায় তাহা উপভোগ করার নামই আমার কাছে বিশ্রাম মনে হয়।
অধ্যাপক ইমান আলী ১৯৯৬ সালের ৯ ই সেপ্টেম্বর তার ঢাকার নিজ বাসগৃহ সাইন্স কর্ণার বাড়িতে ২৪ জয়চন্দ ঘোষলেন, বাংলা বাজার – ঢাকা বাড়িতে মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুর পরে তাকে তার নিজ গ্রাম পারিবারিক কবরস্থানে বাবা মায়ের পাশে সমাধিস্হ করা হয়েছে।
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
মোবাইলঃ01740453802