অন্ধকারে রৌমারী: ঈদ আনন্দের মুখে অন্তহীন লোডশেডিংয়ের কালো ছায়া
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র দুই ঘণ্টাও দেখা মেলে না বিদ্যুতের। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার মানুষের কাছে এটাই এখন নির্মম বাস্তব। তীব্র তাপদাহের মাঝে দিন-রাত মিলিয়ে ২২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎহীন থাকছে পুরো উপজেলা। ফলস্বরূপ, জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে, থমকে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য, আর আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ রূপ নিতে চলেছে চরম হতাশায়। স্থবির জনজীবন, বিপাকে রোগী ও শিক্ষার্থীরা বিদ্যুতের এই ভয়াবহ লুকোচুরিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কোমলমতি শিক্ষার্থী এবং রোগীরা। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বিদ্যুতের অভাবে হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজ সচল না থাকায় নষ্ট হচ্ছে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। শিক্ষার্থীরা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পড়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পাচ্ছে না। ধস নেমেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে
বিদ্যুৎ না থাকায় উপজেলার ব্যবসা-বাণিজ্য এখন খাদের কিনারে। রৌমারীর স্থানীয় দোকানদার মোঃ আমজাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। বেচাবিক্রি একদমই নাই। এভাবে দোকান চালু রাখাই দায় হয়ে পড়েছে।” একই চিত্র মসলা ভাঙানোর মিল থেকে শুরু করে দর্জি পাড়া ও কাপড়ের দোকানগুলোতে। পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে যে উৎসবকালীন কেনাকাটার ধুম লাগার কথা ছিল, তা এখন পুরোপুরি ফিকে। কাপড় ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম নিজের হতাশা ব্যক্ত করে বলেন,
“ঈদকে সামনে রেখে আমার দোকানে প্যান্ট-শার্ট বিক্রির একটা বড় টার্গেট ছিল। কিন্তু এই ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিক্রি একদমই তলানিতে নেমে এসেছে।” প্রভাব পড়েছে পশুর হাটেও! বিদ্যুৎ সংকটের আঁচ লেগেছে কোরবানির পশুর হাটেও। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পশুর স্বাভাবিক আচরণ ও ক্রেতা-বিক্রেতার ভোগান্তি ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রৌমারীর গরুহাটির গরু বিক্রেতা আলতাফ হোসেন জানান এক অদ্ভুত ও দুঃখজনক অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে হাটের পরিবেশ খুব খারাপ ছিল। ফলে গরুটি আমি কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করতে পারিনি। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে আরও ভালো দামে বিক্রি করতে পারতাম।” আসন্ন কোরবানি নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা, সামনে ঈদুল আজহা। এই ঈদের প্রধান একটি অনুষঙ্গ হলো কোরবানির মাংস সংরক্ষণ। রৌমারীর সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই বড় চিন্তা—ঈদের দিনও যদি বিদ্যুৎ না থাকে, তবে কোরবানির মাংস ফ্রিজে রাখা যাবে না। বিপুল পরিমাণ মাংস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় গৃহিণীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। অনেকেই হতাশা প্রকাশ করে বলছেন, মাংস ডিপ ফ্রিজে রাখতে না পারলে সাধারণ মানুষের বড় ধরনের আর্থিক ও পুষ্টিগত ক্ষতি হয়ে যাবে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম এই নজিরবিহীন লোডশেডিংয়ের কারণ জানতে চাইলে রৌমারী পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ইন্সপেক্টর জনাব লোকমান হাকিম জানান: “প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বেশি থাকায় রোটেশন করেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।” সমাধানের খোঁজে, একটি স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশে মাত্র দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রৌমারীর পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের এই যুক্তি মেনে নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় এখন নেই। সামনে ঈদ, এই বিশেষ সময়টুকুর কথা বিবেচনা করে রৌমারী উপজেলায় জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুতের কোটা বা মেগাওয়াট বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে৷ রৌমারীবাসীর আকুল আবেদন—অনতিবিলম্বে এই অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের স্থায়ী সমাধান করা হোক। অন্যথায়, এবারের ঈদুল আজহা রৌমারীর মানুষের কাছে আনন্দের বদলে এক দুঃসহ স্মৃতি হয়ে থাকবে।