পাখি শিকারের মহোৎসব: রৌমারীর জীববৈচিত্র্য চরম ঝুঁকিতে
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের রৌমারী মানেই এক সময় ছিল বিল-ঝিল আর সবুজের সমারোহ, যেখানে ভোরের আলো ফুটত হাজারো পাখির কলকাকলিতে। কিন্তু বর্তমান চিত্রটি ভিন্ন এবং অত্যন্ত পীড়াদায়ক। রৌমারীর আনাচে-কানাচে এখন পাখির গানের বদলে শোনা যায় বন্দুকের গুলির শব্দ। একদল অসাধু শিকারির দাপটে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা দেশি ও পরিযায়ী পাখি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, রৌমারীর বিভিন্ন জলাশয় ও ঝোপঝাড়ে এখন চলছে পাখির মরণযজ্ঞ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এক শ্রেণির প্রভাবশালী ও শৌখিন শিকারি নিয়মিত বন্দুক নিয়ে পাখি শিকারে মেতে উঠছেন। অথচ প্রশাসনের ভূমিকা এখানে অনেকটা 'দর্শক' এর মতো।
আইনের চোখে অপরাধের ব্যাপ্তি
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অত্যন্ত স্পষ্ট। এই আইনের ধারা অনুযায়ী, কোনো বন্যপ্রাণী বা পাখি শিকার করা, হত্যা করা বা বন্দি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনের ৩য় তফশিলভুক্ত পাখিদের ক্ষেত্রে:
শাস্তি: যদি কেউ লাইসেন্স বা অনুমতি ছাড়া পাখি শিকার করেন, তবে তিনি ১ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
পরিযায়ী পাখির ক্ষেত্রে: যদি শিকার করা পাখিটি অতিথি বা পরিযায়ী হয়, তবে শাস্তি ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২ লক্ষ টাকা জরিমানা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—যাঁরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছেন। আত্মরক্ষার জন্য দেওয়া বন্দুকের লাইসেন্স ব্যবহার করে পাখি শিকার করা লাইসেন্সের শর্তাবলির চরম লঙ্ঘন। এটি কেবল বন্যপ্রাণী আইন নয়, বরং অস্ত্র আইনের আওতায়ও দণ্ডনীয় অপরাধ। রৌমারীর সচেতন সমাজকর্মী নাজমুল চৌধুরী (নয়া) যথার্থই বলেছেন, "সমাজের কিছু অসাধু লোকের কারণে রৌমারীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আজ যদি আমরা এদের না থামাই, তবে আগামী প্রজন্ম বইয়ের পাতায় পাখির ছবি দেখবে, বাস্তবে নয়।"
প্রশাসনের এই রহস্যজনক নীরবতা শিকারিদের আরও উৎসাহিত করছে। স্থানীয় বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের উচিত দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত (Mobile Court) পরিচালনা করা এবং শিকারিদের ব্যবহৃত অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা। পাখি কেবল প্রকৃতির শোভা নয়, এরা আমাদের বাস্তুসংস্থানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পোকামাকড় দমনে এবং শস্যের পরাগায়নে পাখির ভূমিকা অপরিসীম। রৌমারীর ঐতিহ্যবাহী জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা চাই প্রশাসন জেগে উঠুক, আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হোক এবং রৌমারীর আকাশ আবারও পাখির ডানায় মুখর হয়ে উঠুক।
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
মোবাইল:01740453802